জয় রায় : বিদেশে চাকরি ও উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে প্রতারণার ফাঁদে ফেলছে এক শ্রেণির অসাধু দালালচক্র। বিশেষ করে সিলেট অঞ্চলে বিদেশগামী শ্রমিকদের টার্গেট করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে প্রতারক সিন্ডিকেট। ভিসা, ওয়ার্ক পারমিট ও চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠছে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে উচ্চ বেতনের চাকরির আশ্বাস দিয়ে প্রথমে নেওয়া হয় মোটা অঙ্কের টাকা। পরে ভিসা জটিলতা, ফাইল প্রসেসিং কিংবা দূতাবাসের অজুহাতে দীর্ঘ সময় পার করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে দেওয়া হয় ভুয়া ভিসা ও নকল কাগজপত্র। আবার কেউ কেউ বিমানবন্দর পর্যন্ত গিয়ে জানতে পারেন তাদের কাগজপত্র জাল।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সিলেট বিভাগের বহু পরিবার বিদেশে কর্মসংস্থানের ওপর নির্ভরশীল। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে প্রতারক চক্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ফেসবুক পেজ এবং ভুয়া অফিস খুলে সাধারণ মানুষকে টার্গেট করছে। বিশেষ করে তরুণ ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো সহজে এসব প্রতারণার শিকার হচ্ছেন।
সম্প্রতি একাধিক ভুক্তভোগী জানান, ইউরোপে পাঠানোর কথা বলে তাদের কাছ থেকে ৫ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে। কিন্তু নির্ধারিত সময় পার হলেও তারা বিদেশ যেতে পারেননি, উল্টো দালালদের অফিস বন্ধ পাওয়া গেছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে বিদেশ যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হলেও অনেকেই দ্রæত যাওয়ার আশায় অবৈধ দালালদের ওপর নির্ভর করছেন। ফলে প্রতারণার ঘটনা বাড়ছে।
সচেতন মহল বলছে, বিদেশে যাওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট এজেন্সির সরকারি অনুমোদন যাচাই, চুক্তিপত্র সংরক্ষণ এবং অতিরিক্ত লোভনীয় প্রস্তাব থেকে সতর্ক থাকা জরুরি। একইসঙ্গে প্রতারকদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তারা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশগামী কর্মীদের জন্য সরকারি তদারকি জোরদার, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং দালালচক্রের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা না গেলে এ ধরনের প্রতারণা আরও বাড়তে পারে।
সম্প্রতি ইউরোপের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশে পাঠিয়ে কাজ না দিয়েই মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে কিছু অসাধু ব্যবসায়ীরা। এমন অনেকের সাথে কথা বলে এই প্রতিবেদক জানতে পারেন যে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে সৌদি আরব ও কাতার। যেখানে প্রতি যাত্রীর কাছ থেকে তিন থেকে সাড়ে পাঁচ লক্ষ কিংবা ৬ লক্ষ টাকা ভিসার দাম বাবদ হাতিয়ে নিয়ে সৌদি আরবে পোঁছার পর সঠিক কাজ না দিতে পেরে একপর্যায়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় যাত্রী এবং ওই অসাধু ব্যবসায়ীদের।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার এক ভুক্তভোগী প্রবাসী জানান, বিগত ৮ মাস আগে প্রায় সাড়ে চার লক্ষ টাকা খরচ করে সিলেটের উপশহরের এক ব্যবসায়ীর কাছে থেকে সৌদি আরবের ভিসা কিনেন তিনি। ভিসা প্রসেসিং শুরু করার আট মাস পর গত ১১ মার্চ সৌদি আরবে আসার পর হতবাক হয়ে পড়েন তিনি।
তিনি জানান, ওই ব্যবসায়ীর সাথে তার লিখিত চুক্তিপত্র হয়েছিল। চুক্তিপত্রে উল্লেখ ছিল ১৫০০ রিয়াল বেতন এবং এক বছরের ইকামা দেওয়া হবে তাকে। কিন্তু সৌদি আরবে আসার তিন মাস পেরিয়ে গেলেও এক বছরের আকামা তাকে দেওয়া হয়নি এবং কাজের সন্ধান দেওয়া হয়নি। এমনকি এয়ারপোর্ট থেকে তাকে কেউ নিতেও আসেনি।
ঐ প্রবাসী বলেন, আমার কাছে সকল তথ্য এবং প্রমাণ রয়েছে এবং আমি সৌদি আরবে আসার পর এমন হাজারো ঘটনার সাক্ষী হয়েছি। এখানে এসে দেখতে পারছি আমার মত করেই বেশিরভাগ লোকই প্রতারণা শিকার হয়ে আজ অসহায় জীবনযাপন করছেন সৌদি আরবের মাটিতে। তাই এর সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন তিনি।
এমন ঘটনা নতুন নয় সিলেটের অনেক ব্যবসায়ী এইভাবেই প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে সর্বস্বান্ত করছে অনেক মানুষকে। এ ধরনের ঘটনার শিকার হয়ে অনেক ভুক্তভোগী কোেনা রকমের টিকে থাকতে পারলেও বেশিরভাগ ভুক্তভোগী দেশে ফেরত চলে আসছেন। দেশে ফেরত আসতে চাইলেও অনেক ঝামেলায় পড়তে হয় প্রবাসীদের। অনেকেই দেশে ফিরে ওইসব অসাধু ব্যবসায়ী কিংবা দালাল প্রকৃতির লোকেদের কাছে নিজের ক্ষতিপূরণ বা নিজের দেয়া অর্থ ফেরত চাইলে অনেককে হুমকির মুখোমুখিও হতে হচ্ছে বলেও তথ্য রয়েছে।
সম্প্রতি এধরনের ঘটনায় সর্ব শান্ত হচ্ছেন সিলেটসহ দেশের অগণিত মানুষ। তাই এখনই এই ধরনের অসাধু ব্যবসায়ীদের লাগাম টেনে না ধরলে বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে সিলেটের বহু মানুষের। আর তাই এসব ঘটনার প্রতিকার চান ভুক্তভোগী ও সমাজের সচেতন মানুষ।